কবিয়াল রমেশ শীলকে জাতীয় লোককবি ঘোষণার দাবী
গণমানুষের কবি, সংগ্রামের বাতিঘর: কবিয়াল রমেশ শীলকে জাতীয় কবি ঘোষণার দাবি
বাংলাদেশের লোকসাহিত্য ও গণসংগীতের আকাশে কবিয়াল রমেশ শীল (১৮৭৭-১৯৬৭) এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। তিনি কেবল একজন কবিয়াল ছিলেন না, ছিলেন গণমানুষের কণ্ঠস্বর, যিনি ঐতিহ্যবাহী কবিগানকে পুঁথিগত পৌরাণিক আখ্যানের গণ্ডি থেকে মুক্ত করে সমাজ-সচেতনতা, প্রতিবাদ ও সংগ্রামের হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন। তাঁর এই যুগান্তকারী অবদানের জন্য এবং বাংলার গণ-জাগরণে তাঁর অসামান্য ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে জাতীয় কবি ঘোষণার দাবি আজ অত্যন্ত যৌক্তিক ও সময়ের দাবি।
১. কবিগানের রূপকার ও সমাজ-সচেতনতার প্রতীক
ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন: রমেশ শীল প্রথাগত কবিগানে পৌরাণিক বিষয়বস্তুর পরিবর্তে সমসাময়িক সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা, যেমন—মহাজনি শোষণ, দুর্নীতি, দুর্ভিক্ষ, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, ভাষা আন্দোলন এবং নূরুল আমিন বিরোধী আন্দোলনকে উপজীব্য করেন।
প্রতিবাদী কণ্ঠ: তাঁর গান ছিল কৃষক-শ্রমিক-বঞ্চিত মানুষের জয়গান। ব্রিটিশের শোষণ, পাকিস্তানের স্বৈরাচার এবং সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁর গান রণতূর্য বা রণভেরীর মতো কাজ করেছে। যেমন: “বাংলার জন্য জীবন গেলে হব স্বর্গবাসী / আমার বাংলার দাবি ঠিক থাকিবে যদিও হয় ফাঁসি”।
কারাবরণ: প্রগতিশীল ও সংগ্রামী ভূমিকার কারণে তিনি ১৯৫৪ সালে কারাবরণও করেন, যা তাঁর আপোষহীন চেতনার প্রমাণ দেয়। পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত রচনার লোভনীয় প্রস্তাবও তিনি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
২. অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিক চেতনার ধারক
মানবতার জয়গান: রমেশ শীল ছিলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক, অসাম্প্রদায়িক ও মুক্ত মনের অধিকারী। তিনি দ্বিধাহীনভাবে ঘোষণা করেন— “হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান বৌদ্ধ সকল ধর্মের এক কথা” এবং “মাটির মূর্তির পূজা ছেড়ে মানুষ পূজা কর”।
মাইজভাণ্ডারী গানের সাধক: তিনি মাইজভাণ্ডারী তরিকার আধ্যাত্মিক গানেরও অন্যতম রূপকার। তাঁর রচিত মাইজভাণ্ডারী গানগুলো (যেমন: ‘ইস্কুল খুইলাছে রে মওলা, ইস্কুল খুইলাছে’) আঞ্চলিক সংস্কৃতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
৩. জাতীয় স্বীকৃতির অপরিহার্যতা
কবিয়াল রমেশ শীল তাঁর জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তির খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাঁকে ১৯৬২ সালে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি শ্রেষ্ঠ লোককবির সম্মানে ভূষিত করে এবং ২০০২ সালে তিনি মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন।
তবে, তাঁর কর্মের বিশালতা এবং স্বাধীনতাকামী জনতাকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা বিবেচনা করে, এই সম্মান যথেষ্ট নয়। জাতীয় কবি ঘোষণা তাঁকে লোকসাহিত্যের একজন শিল্পী হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে, বাঙালি জাতিসত্তা গঠনে এবং গণমানুষের চেতনায় আলো ছড়ানোর ক্ষেত্রে তাঁর সর্বব্যাপী ভূমিকাকেই চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেবে।
উপসংহার
রমেশ শীল আমাদের লোকসংস্কৃতির মূলধারাকে আধুনিক প্রতিবাদী চেতনার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর গান বাংলার মাটির গন্ধ বহন করে, মানুষের দুঃখ-বেদনার কথা বলে। তিনি ছিলেন একাধারে কবিয়াল, সাধক ও রাজনৈতিক কর্মী। এমন একজন মহৎ কবিকে জাতীয় কবির আসনে বরণ করে নেওয়া আমাদের জাতীয় কর্তব্য।
আমরা বিশ্বাস করি, গণমানুষের এই কবিকে জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে তাঁর প্রাপ্য সম্মান প্রতিষ্ঠা হবে।



আপনার মতামত লিখুন