পদ্মার চরে লাশের মিছিল: নেপথ্যে কাকন বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোন্দল

রাজশাহী প্রতিনিধি
প্রকাশের সময়: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬ । ৬:৪৭ অপরাহ্ণ

রাজশাহীর বাঘা, নাটোরের লালপুর, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার বিস্তীর্ণ পদ্মার চরে চলছে লাশের মিছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাকন গ্রুপের এক সদস্য জানান, ‘হঠাৎ কিছুদিন ধরে একের পর এক গোলাগুলি ও হত্যাকাণ্ডের পেছনে মূলত কাকনের অবর্তমানে বাহিনী পরিচালনায় নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মিলন চৌধুরীর বাহিনী ও ঝড়ু মস্তানের মৃত্যুর পর ঝড়ুরদায়িত্ব প্রাপ্ত আবু বক্কর ওরফে কিলার বক্কার বাহিনীর মধ্যে ১৫ তারিখ দিবাগত রাত থেকে শুরু করে পরেরদিন ভোর পর্যন্ত পরিচালিত অবৈধ বালু উত্তোলনের টাকা তোলার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারনে হত্যাকান্ড সংগঠিত হচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন

তার ভাষ্যমতে, ‘বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে কাকন বাহিনীর চার জেলার পদ্মার চরে ছিল একক আধিপত্য । তখন সরাসরি আওয়ামীলীগ নেতাদের প্রত্যক্ষ সমর্থন থাকার কারনে ইঞ্জিনিয়ার কাকন গড়ে তোলেন বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী । আর এই বাহিনী দিয়ে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন চার জেলার পদ্মা চরের উর্বর ফসলের জমি, বালু মহাল, চোরাচালান ও মাদকের রমরমা কারবার। বিগত আওয়ামীলীগের সরকারের সময়ও এই নদী এবং বিস্তীর্ণ চর এলাকা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাকন এবং মিলন বাহিনীর দ্বন্দ্ব হয়েছিল। তখন কাকন বাহিনীর লোক মিলন চৌধুরীর বাড়িতে গুলি করেও এসেছিল । পরবর্তীতে কিছু ব্যবসায়িক এবং আওয়ামীলীগ নেতাদের হস্তক্ষেপে বিষয়টি সমাধান হয় এবং পুনরায় কাকনের নেতৃত্বে নদী এবং চরের সমস্ত অনৈতিক কাজ একসঙ্গে পরিচালিত হয়ে আসছিল । কিন্তু ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পর আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতারা সবাই পালিয়ে গেলে কাকনের সম্রাজ্য কিছুটা হুমকির মুখে পড়ে। মিলন চৌধুরী যুবলীগের নেতা হওয়ায় তার অবস্থাও চারিদিকে টালমাটাল হয়ে ওঠে ।

যোগোযোগ: ০১৮৩০৩৯৩৪৩৯

কিন্তু সুচতুর কাকন পট পরিবর্তনের সাথে সাথেই বিএনপির কিছু অসৎ রাজনৈতিক ব্যক্তি, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও প্রশাসনকে হাত করে নিয়ে পদ্মা চরের বালু মহাল থেকে শুরু করে সবকিছুতে তারই নিয়ন্ত্রণ পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করে । ৫ই আগস্টের আগের মত স্থানীয় কৃষক , রাখাল, মাছ ধরার জেলেসহ নদী পাড়ের বাসিন্দা ও নদীকেন্দ্রিক সাধারণ মানুষের (জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস) উপর চাঁদা নির্ধারণ করতে শুরু করে। যা ৫ই আগস্টের পর এমন অত্যাচার অনেকেই মেনে নিতে চায়নি। তাই যেখানেই আধিপত্য বিস্তার করতে চেষ্টা করেছে সেখানেই সাধারণ মানুষ সাহস করে এই কাকন বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শুরু করে এবং মামলা করে বসে। ফলে প্রশাসনও নড়েচড়ে বসে। পরিচালিত হয় বেশ কিছু অভিযান। তেমনই গত ১৭ জুলাই ২০২৫ তারিখে যৌথ বাহিনীর অভিযান পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে দেখা যায় অসৎ রাজনৈতিক ব্যক্তি, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও প্রশাসনকে হাত করে নেওয়ার চিত্র।

যোগাযোগ ০১৮৩০ ৩৯৩৪৩৯

সেখানে দেখা যায় বালু মহালে কাকনের অংশীদার হলো- ঈশ্বরদী পৌর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিলন চৌধুরী, লালপুর উপজেলা বিএনপি নেতা শিল্পী, ভেড়ামারার বিএনপি নেতা ফাহাদ, বিপ্লব মালিথা, হেলাল, বাগাতিপাড়া উপজেলার ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মোল্লা, আরআরপি গ্রুপের পরিচালক রফিক। আরও উঠে আসে সাংবাদিক পায়েল হোসেন রিন্টুর নাম। এছাড়াও উঠে আসে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দেওয়া মাসোহারার তালিকা।’
‘কিন্তু এতগুলো ভিন্নমতের ব্যক্তিদের মধ্যে ঐক্য ঠিক রাখতে পারেনি কাকন। মাঝে মাঝেই বালুর টাকা ভাগাভাগি নিয়ে হত মনোমালিন্য।’
‘এরমধ্যে গত ২৭ অক্টোবর ২০২৫ দৌলতপুরের পদ্মা নদীর দুর্গম চরে এই বাহিনীর গুলিতে দুই কৃষক নিহত হলে দেশের শীর্ষ পত্রিকা ও টিভিতে কাকনের ছবিসহ সংবাদ প্রকাশিত হয়। ফলে প্রশাসন অপারেশন ফার্স্ট লাইট নামে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এরপর থেকে কাকন আত্মগোপনে চলে যায়।’
‘তারপর আবার চলতি বছরে লালপুরের দিয়াড়বাহাদুপুর বালু মহাল সরকারিভাবে ইজারা দেয়নি। ফলে আরও বিপাকে পড়তে হয় কাকনকে। এখন রাতের আধারে চুরি করে বালু উত্তোলন করতে হচ্ছে কাকন বাহিনীকে।’
‘পূর্বের টাকার ভাগাভাগি নিয়ে অংশীদারদের মধ্যে কোন্দল ছিলই তারপর বর্তমানে চুরি করে বালু উত্তোলন ও টাকা ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের মধ্যে অবিশ্বাস ও কোন্দল চরমে পৌছেছে। এর ফলে পদ্মার চরে একের পর এক ঝড়ছে তাজা প্রাণ।’
‘সম্প্রতি কাকন বাহিনীর অন্যতম নেতা আজিজুল হক ঝড়ু মস্তান নিহত হলে তার স্থলে সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্ব পান আবু বক্কর ওরফের কিলার বক্কার। অপরদিকে কাকনের অপর আরেক সহযোগী ঈশ্বরদী পৌর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিলন চৌধুরীর পূর্ব থেকে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে আসছিল।’
‘ঝড়ু মস্তানের মৃত্যুর পরে নিজেদের মধ্যে অবিশ্বাসের কারনে চরে বেশ কিছু গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে। এরমধ্যে গত ১৫ জুন রাতে লালপুরের রাইটার চরে চুরি করে বালু উত্তোলন করা হয়। ভোরে সেই টাকার ভাগাভাগি নিয়ে যুবলীগের মিলন চৌধুরী বাহিনীর লোক ও কিলার বক্কারের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। পরে সকাল ৭ টার দিকে বক্কার মিলন চৌধুরীর লোকজনের উপর হামলা করলে সাহাবুল প্রামাণিক (৪২) গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয় এবং আরেকজন নিখোঁজ হয়।’

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে কিলার বক্কার ও মিলন চৌধুরী বাহিনীর মধ্যে কোন্দল চরম আকার ধারন করেছে।’
এদিকে শাহাবুলের মৃতদেহ পাওয়ার বিষয়ে লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘হত্যাকান্ডের ঘটনা সংক্রান্ত আমরা কোন সূত্র এখনো পাইনি, শুধুমাত্র লাশ পেয়েছি। এটা খুন কিনা না এটা আমরা কনফার্ম না। যেহেতু ঘটনাস্থল নৌ পুলিশের আন্ডারে, তাই লক্ষ্মীকুন্ড নৌ পুলিশ ফাড়ি লাশ উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। ময়নাতদন্ত হবে। এরপরে পরবর্তীতে যদি কেউ মামলা দিলে আমরা আইন অনুযায়ী সেই মামলার জুরিসডিকশনে তদন্তের জন্য লক্ষ্মীকুন্ড নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে দেবো।’
এবিষয়ে লক্ষ্মীকুন্ডা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির উপ পুলিশ পরিদর্শক মোঃ সেলিম মিয়া বলেন, ‘দুপুর ১২ টার দিকে লালপুর থানা কর্তৃক বিষয়টি জানতে পারি। পরে আশেপাশে খোঁজাখুঁজির সময় লালপুর রায়টা উত্তর চরে ভাসমান নৌকার ভিতর থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। মরদেহের সুরতহাল রিপোর্টের জন্য থানা হেফাজতে রাখা আছে এবং আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।’

সম্পাদক: মনজুর আলম, প্রকাশক: আমিন উদ্দীন ।  কপিরাইট © প্রথম সকাল কর্তৃক সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন