দীর্ঘ ১৭ বছরের যুক্তরাজ্যের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার ইচ্ছার কথা জানালেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, নারী-পুরুষ-শিশুসহ সব শ্রেণি-পেশা এবং সব ধর্মের মানুষ যাতে নিরাপদে থাকে, সেই চেষ্টা তাঁর ও তাদের দলের থাকবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকার পূর্বাচলের ৩০০ ফুট এলাকায় গণসংবর্ধনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান এসব কথা বলেন। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে এই সংবর্ধনার আয়োজন করে বিএনপি। এ সময় তিনি শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার প্রত্যয় ব্যক্ত করে যে কোনো উস্কানির মুখে শান্ত থাকতে সবাইকে আহ্বান জানান।
সবাই মিলে দেশ গড়ার প্রত্যয় জানিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা দেশের শান্তি চাই। আমরা সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলব, যা একজন মা দেখেন। যে বাংলাদেশে একজন মানুষ নিরাপদে ঘর থেকে বের হতে পারে এবং নিরাপদে ঘরে ফিরে আসতে পারে।
‘প্রিয় বাংলাদেশ’ বলে শুরু করা বক্তব্যে তারেক রহমান দেশের মানুষের জন্য, দেশের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য তাঁর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে বলে জানান।
এ সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কিংবদন্তি কৃষ্ণাঙ্গ নেতা ও মানবাধিকারকর্মী মার্টিন লুথার কিংয়ের বিখ্যাত ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ ভাষণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন সদস্য হিসেবে আমি বলতে চাই ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি ‘দেশের মানুষের জন্য, দেশের জন্য আমার একটি পরিকল্পনা আছে’ এই পরিকল্পনা দেশের মানুষের স্বার্থে, দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জোর দিয়ে বলেন, ‘যে কোনো মূল্যে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে। আমরা দেশের শান্তি চাই, শান্তি চাই, শান্তি চাই।’
বিকেল ৪টার আগে পূর্বাচলে জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে আয়োজিত সংবর্ধনা মঞ্চে ওঠেন তারেক রহমান। লন্ডন থেকে দীর্ঘ পথ ভ্রমণের পর সিলেট হয়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন তিনি। সেখান থেকে বুলেটপ্রুফ বাসে পুরোটা পথ দাঁড়িয়ে তিনি লাখ লাখ নেতাকর্মীর শুভেচ্ছার জবাব দিতে দিতে সংবর্ধনা মঞ্চে পৌঁছান। মঞ্চে ওঠার পর তিনি উপস্থিত জ্যেষ্ঠ নেতা ও জোট শরিকের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
তারেক রহমান বলেন, যদি সেই কার্যক্রম, সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে হয়, তাহলে এই জনসমুদ্রে যত মানুষ উপস্থিত আছেন এবং সারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শক্তির যত মানুষ আছেন, প্রত্যেক মানুষের সহযোগিতা আমার লাগবে।
আমাদের ধৈর্যশীল হতে হবে।
ওসমান হাদিকে স্মরণ:
তারেক রহমান বলেন, ‘কয়েক দিন আগে এই বাংলাদেশে চব্বিশের আন্দোলনের এক সাহসী প্রজন্মের সদস্য ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে; ওসমান হাদি শহীদ হয়েছেন। ওসমান হাদি চেয়েছিলেন, এই দেশের মানুষের জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক, এই দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক, এই দেশের মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ফিরে পাক। আজ চব্বিশের আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন– ওসমান হাদিসহ বিগত স্বৈরাচারের সময় যারা গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের রক্তের ঋণ যদি শোধ করতে হয়, তবে আসুন আমরা আমাদের সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলি। যেখানে আমরা সবাই মিলে কাজ করব, যেখানে আমরা সবাই মিলে আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশকে গড়ে তুলব।
তিনি ১৬ মিনিট বক্তব্য দেন।
প্লাস্টিকের চেয়ারে বসলেন তারেক রহমান
রাজধানীর ৩০০ ফুট সড়কে আয়োজিত গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নিজের জন্য নির্ধারিত বিশেষ আসন সরিয়ে তারেক রহমান প্লাস্টিকের চেয়ারে বসেন। মঞ্চে সারি সারি চেয়ার পাতা ছিল এবং প্রটোকল অনুযায়ী প্রতিটি চেয়ারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামও লেখা ছিল। মঞ্চের ঠিক মাঝখানে তারেক রহমানের জন্য রাখা ছিল বিশেষ নকশার একটি চেয়ার। তিনি সেটিতে না বসে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসেন।
মায়ের জন্য চাইলেন দোয়া:
মা খালেদা জিয়ার অসুস্থতার প্রসঙ্গ তুলে তারেক রহমান বলেন, ‘সন্তান হিসেবে আমার মন আমার মায়ের বিছানার পাশে পড়ে আছে, সেই হাসপাতালের ঘরে। কিন্তু যেই মানুষটি এই দেশের মাটির জন্য, মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই মানুষগুলোকে (জনতা) আমি কোনোভাবেই ফেলে যেতে পারি না। সে জন্যই আজ হাসপাতালে যাওয়ার আগে আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য এখানে দাঁড়িয়েছি।
সংবর্ধনায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ।
সংবর্ধনা মঞ্চে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ছিলেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়,নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সেলিমা রহমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু,এ জেড এম জাহিদ হোসেন প্রমুখ।
দীর্ঘদিনের যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গীর মধ্যে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক নুরুল আমিন ব্যাপারী প্রমুখ।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর প্রথমে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করবেন। সেখান থেকে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।
ওসমান হাদির কবর জিয়ারত শেষে সেখান থেকে রাজধানীর শ্যামলীতে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের দেখতে যাবেন তারেক রহমান। এরপর আরেকটি অনুষ্ঠান হবে। তার বিস্তারিত এখনও জানানো হয়নি।

প্রথম সকাল প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ । ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ