সিএমপির ওসি বাবুল আজাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি থেকে নারী হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।

শেখ শহীদুল হক বাবলু নিজস্ব প্রতিনিধি,চট্টগ্রাম।।
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৫ । ১১:১১ অপরাহ্ণ

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ডবলমুরিং মডেল থানা যেন এখন সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের একটি নাম। এখানকার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবুল আজাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া এবং এমনকি নারী পুলিশ সদস্যদের যৌন হয়রানির মতো গুরুতর সব অভিযোগ উঠেছে।

তার কর্মকাণ্ডে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার পাশাপাশি এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ ও শংকা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওসি বাবুল আজাদ ডবলমুরিং থানায় যোগদানের পর থেকেই একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, গত বছর জুলাই মাসে দেশব্যাপী সংঘটিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে পুঁজি করে তিনি এক নতুন ধরনের ‘মামলা বাণিজ্যে’ নামেন। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতা ও ছাত্রহত্যার মামলায় এলাকার বহুনিরাপরাধ ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে আসামি করার ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আগ্রাবাদের কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, আমাদের অনেককেই ডেকে নিয়ে হুমকি দেওয়া হয়।
বলা হয়, টাকা না দিলে ছাত্রহত্যার মামলায় আসামি করে দেওয়া হবে। জীবন ও সম্মান বাঁচাতে আমরা সর্বস্বান্ত হয়েছি। ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পাই না।”

শুধু তাই নয়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের টার্গেট করে এসআই ও এএসআইদের নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে নির্যাতন ও অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে ওসি বাবুল আজাদের বিরুদ্ধে।

ডবলমুরিং থানা এলাকাটি মাদক কারবারের জন্য অন্যতম রুট হিসেবে পরিচিত হলেও ওসির নেই কোন জোরালো ভূমিকা। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, ওসি বাবুল আজাদ এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা নেন তিনি। মাসোয়ারার বিনিময়ে মাদক ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে তাদের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে বলে স্হানীয়রা আমাদের প্রতিনিধিকে জানান। মাঝেমধ্যে লোক দেখানো কিছু অভিযান চালানো হলেও বড় কোনো মাদক কারবারি কখনও ধরা পড়ে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এর ফলে এলাকার যুব সমাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ওসি বাবুল আজাদের বিরুদ্ধে নৈতিক অভিযোগটিও বেশ গুরুতর। থানার অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র জানায়, তিনি তার কার্যালয়ে নারী পুলিশ কনস্টেবলদের ডেকে নিয়ে প্রায়ই কুরুচিপূর্ণ ও আপত্তিকর প্রস্তাব দেন। তার ভয়ে নারী সদস্যরা সবসময় ইতটস্থ থাকেন।

অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ওসি বাবুল আজাদের বিরুদ্ধে এর আগেও ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে একটি বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। সেই মামলার তদন্ত এখনও চলমান। এমন একজন কর্মকর্তার গুরুত্বপূর্ণ থানার দায়িত্বে থাকা নিয়ে পুলিশ বাহিনীর ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে।

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে ওসি বাবুল আজাদের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারাও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এই নীরবতা ভুক্তভোগীদের আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা বলছেন, ওসি বাবুল আজাদের ক্ষমতার দাপট এতই বেশি যে, তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ করলে জীবননাশের হুমকি রয়েছে। তাই তারা একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।

একাধিক মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন এমন ধারাবাহিক ও গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তখন তাকে দায়িত্বে রেখে সুষ্ঠু তদন্ত সম্ভব নয়। তাদের মতে, অবিলম্বে ওসি বাবুল আজাদকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা প্রয়োজন। যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পুলিশ বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা ফিরে আসে।

জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই যদি অনিরাপত্তার অভিযোগ ওঠে, তবে বিচার চাইবার আর জায়গা থাকে না। ডবলমুরিং থানার এই পরিস্থিতি পুরো পুলিশ বাহিনীকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এখন দেখার বিষয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগগুলোকে কতটা গুরুত্বের সাথে নেয় এবং ন্যায়বিচারের পথ সুগম করে।

সম্পাদক: মনজুর আলম, প্রকাশক: আমিন উদ্দীন ।  কপিরাইট © প্রথম সকাল কর্তৃক সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন