খালে বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দুইজন গ্রেপ্তার, হত্যায় ব্যবহৃত সাম্পান জব্দ
চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর শিকলবাহা খাল থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হওয়া জান্নাতুল ফেরদৌসের (২৮) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত সংস্থাটির দাবি, দ্বিতীয় স্বামীর আগের বিয়ের বিষয়টি জানার পর দাম্পত্য কলহের জেরে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় জান্নাতুলকে। পরে তাঁর হাত-পা বেঁধে বস্তায় ভরে খালে ফেলে দেওয়া হয় মরদেহ।
এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মুসলিম উদ্দিন (৩৯) ও শুক্কুর আহম্মদকে (২৪) গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সাম্পানটিও জব্দ করা হয়েছে। তবে মামলার প্রধান অভিযুক্ত রাজা মিয়া ওরফে রাজুর বিষয়ে তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা এবং তাঁর অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

01830 393439
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন।
পিবিআইয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত জান্নাতুল ফেরদৌস বাঁশখালীর শিলকুপ ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের একটি জুতা তৈরির কারখানায় চাকরি করতেন। সাত বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে নগরের চান্দগাঁও থানার বাহির সিগন্যাল এলাকার ব্যাপারীপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় দ্বিতীয় স্বামী রাজা মিয়া ওরফে রাজুর সঙ্গে বসবাস করতেন।
প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাজা মিয়াকে বিয়ে করেন জান্নাতুল। বিয়ের সময় রাজা মিয়া নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে পিবিআই। পরে তাঁর আগের স্ত্রী থাকার বিষয়টি জানার পর দম্পতির মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। তদন্ত সংস্থার দাবি, এ বিরোধই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার পেছনে অন্যতম কারণ।
তবে দাম্পত্য বিরোধ থেকে কীভাবে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পরিকল্পনায় কার কী ভূমিকা ছিল এবং ঘটনার আগে অভিযুক্তদের মধ্যে কী ধরনের যোগাযোগ হয়েছিল—এসব বিষয়ে তদন্তের আরও তথ্য সামনে এলে হত্যাকাণ্ডের পুরো চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

০১৮৩০ ৩৯৩৪৩৯
পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসা তথ্যের বরাতে জানা যায়, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যায় বেড়ানোর কথা বলে জান্নাতুলকে কর্ণফুলী নদীর ব্রিজঘাট এলাকায় নিয়ে যান রাজা মিয়া। সেখানে আগে থেকেই কয়েকজন ব্যক্তি একটি সাম্পান নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। পরে জান্নাতুলকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা নৌকায় করে শিকলবাহা খালের দিকে রওনা হন।
তদন্ত সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ৮টার পর সাম্পানের মধ্যে রাজা মিয়ার সঙ্গে জান্নাতুলের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে খালে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর রাজা মিয়া ও তাঁর সহযোগীরা রশি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে জান্নাতুলকে হত্যা করেন বলে পিবিআইয়ের দাবি।
হত্যার পর মরদেহের হাত-পা বেঁধে একটি বস্তায় ভরা হয়। পরে কর্ণফুলী থানাধীন কালারপোল এলাকায় এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পেছনের শিকলবাহা খালে মরদেহটি ফেলে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
গত ২ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের লঞ্চঘাটসংলগ্ন খাল থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় এক নারীর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করে সদরঘাট নৌ-পুলিশ। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি নিখোঁজ জান্নাতুল ফেরদৌসের বলে শনাক্ত করেন।
এ ঘটনায় জান্নাতুলের মা ছায়রা খাতুন বাদী হয়ে ৩ আগস্ট কর্ণফুলী থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় রাজা মিয়া ওরফে রাজু এবং অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়।
মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং মরদেহ খালে ফেলে দেওয়ার ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। পরে গত ৬ অক্টোবর মামলাটির তদন্তভার পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পিবিআই জানায়, পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেনের তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় মামলাটির তদন্ত শুরু হয়। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে টেকনাফ এলাকায় অভিযান চালিয়ে মুসলিম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় শুক্কুর আহম্মদকে।
শুক্কুর আহম্মদের হেফাজতে থাকা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সাম্পানটিও জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পিবিআই। তদন্তকারীদের ধারণা, সাম্পানটির সংশ্লিষ্টতা যাচাই এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বক্তব্যের সঙ্গে অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ মিলিয়ে দেখার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
পিবিআইয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গ্রেপ্তার মুসলিম উদ্দিন গত ১৪ অক্টোবর আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ওই জবানবন্দিতে তিনি নিজের সংশ্লিষ্টতা ও হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন বলে দাবি করেছে তদন্ত সংস্থা।

পিবিআইয়ের দাবি অনুযায়ী, জান্নাতুল হত্যাকাণ্ডের পেছনে দাম্পত্য বিরোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে হত্যার পরিকল্পনা কখন ও কোথায় করা হয়েছিল, ঘটনার সময় সাম্পানে ঠিক কতজন ছিলেন, প্রত্যেকের ভূমিকা কী ছিল এবং হত্যার পর অভিযুক্তরা কীভাবে ঘটনাটি আড়াল করার চেষ্টা করেন—এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি রাজা মিয়া ওরফে রাজুর বিষয়ে তদন্তের অগ্রগতি, তাঁর অবস্থান এবং হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত অন্য ব্যক্তিদের পরিচয়ও গুরুত্বপূর্ণ। এসব তথ্য নিশ্চিত হলে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা থেকে মরদেহ গুমের চেষ্টা পর্যন্ত পুরো ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেপ্তার আসামিদের পুলিশ হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদসহ মামলাটির তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্ত শেষ হলে হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল, তা আরও পরিষ্কার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ৪:১২ অপরাহ্ণ